
নিজস্ব প্রতিবেদক >>
দীর্ঘদিনের সশস্ত্র চরমপন্থি তৎপরতার অবসান ঘটিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার প্রত্যয়ে আত্মসমর্পণ করেছেন ৬৫ জন চরমপন্থি সদস্য। সিরাজগঞ্জ, পাবনা ও রাজবাড়ী জেলার এসব সদস্যের কেউ নিষিদ্ধঘোষিত পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি, কেউ পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি, আবার কেউ নিউ বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন।
রোববার (১ নভেম্বর) দুপুরে সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুলে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি-১২)-এর প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার ফারজানা শারমিন পুতুলের উপস্থিতিতে তাঁরা আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন পুতুল বলেন, ভুল পথে পরিচালিত হয়ে যারা উগ্রবাদী ও চরমপন্থি সংগঠনে যুক্ত হয়েছিলেন, তাঁরা নিজেদের ভুল উপলব্ধি করে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এটি ইতিবাচক উদ্যোগ। বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অত্যন্ত দক্ষ। তাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে পার পাওয়ার সুযোগ নেই।
তিনি আরও বলেন, আত্মসমর্পণকারীরা যাতে নতুন করে জীবন শুরু করতে পারেন, সে লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী তাঁদের আর্থিক অনুদান দিয়েছেন। পাশাপাশি আইনি সহায়তার মাধ্যমে তাঁদের স্বাভাবিক জীবনে পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেবে সরকার।
এসআরবি-১২-এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি আতিকুর রহমান মিয়ার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সিরাজগঞ্জ-৫ (বেলকুচি-চৌহালী) আসনের সংসদ সদস্য আমিরুল ইসলাম খান আলীম, এসআরবি ফোর্সেসের মহাপরিচালক অতিরিক্ত আইজিপি আহসান হাবিব পলাশ, অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশনস) কর্নেল ইফতেখার আহমেদ, পুলিশের রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি আশিক সাঈদ এবং রাজশাহীর অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (উন্নয়ন) শাহানা আখতার জাহান।
অনুষ্ঠানে বক্তারা জানান, আত্মসমর্পণকারীদের বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলো পর্যালোচনা করে পুনর্বাসনের বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। বিচারাধীন মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। তবে আত্মসমর্পণের অর্থ দায়মুক্তি নয়। হত্যা, ডাকাতি, বিস্ফোরক ও অস্ত্রসহ বিভিন্ন অপরাধে দায়ের করা নিয়মিত মামলাগুলোর বিচারিক কার্যক্রম প্রচলিত আইন অনুযায়ী চলবে।
আত্মসমর্পণকারীদের একজন পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ও রাজবাড়ী জেলার বাসিন্দা সালমান বলেন, সরকার তাঁদের ভালো হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। তাই অন্ধকারের পথ ছেড়ে আলোর পথে ফিরছেন তাঁরা। এমন সুযোগ পেয়ে তিনি অত্যন্ত আনন্দিত।
আরেক আত্মসমর্পণকারী আইনুল হোসেন বলেন, ভুল পথে চলতে গিয়ে জীবনের অনেক মূল্যবান সময় ও সম্পদ হারিয়েছেন। এভাবে কেটে গেছে প্রায় ১৫ বছর। এখন পরিবার-পরিজন নিয়ে সমাজে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করে জীবনের বাকি সময়টুকু কাটাতে চান।
উল্লেখ্য, সিরাজগঞ্জ অঞ্চলে চরমপন্থি তৎপরতা নিয়ন্ত্রণে আত্মসমর্পণের উদ্যোগ নতুন নয়। ১৯৯৮ সালে সিরাজগঞ্জের কামারখন্দে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রয়াত মোহাম্মদ নাসিমের কাছে অস্ত্র জমা দিয়ে শতাধিক চরমপন্থি সদস্য আত্মসমর্পণ করেন। পরবর্তী সময়ে ২০১৯ সালের ৯ এপ্রিল পাবনায় পুলিশের কাছে ৫৯৬ জন এবং ২০২৩ সালের ২১ মে সিরাজগঞ্জে তৎকালীন র্যাব-১২ কার্যালয়ে সাত জেলার আরও ৩২৩ জন চরমপন্থি সদস্য আত্মসমর্পণ করেন।
এরই ধারাবাহিকতায় এবার সিরাজগঞ্জ, পাবনা ও রাজবাড়ী জেলার আরও ৬৫ জন চরমপন্থি সদস্য আত্মসমর্পণ করলেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, অপরাধের পথ থেকে ফিরে আসার সুযোগ সৃষ্টি, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং পুনর্বাসনের কার্যকর উদ্যোগ এই তিনের সমন্বয়ই পারে সমাজে স্থায়ী শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে।